reporter খবর ২৪ ঘন্টা , ডেস্ক
প্রকাশ : 24 মে 2026 ইং
৯৮ বার পড়া হয়েছে

আজ নিমগাছীতে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা ও জামাই বরণ উৎসব

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের “বাঁশের মেলা” বা “জামাই বরণ মেলা”। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার বসা এ লোকজ উৎসব প্রায় সাড়ে চারশ বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন শুধু একটি মেলা নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে।

দুই দিনব্যাপী এ মেলায় অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় মানুষ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য, দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী এবং আত্মীয়-স্বজন। বিশেষ করে জামাই আপ্যায়নকে কেন্দ্র করে মেলাটি এলাকায় “জামাই মেলা” নামেও ব্যাপক পরিচিত।

বাংলার হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মেলা। সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও নিমগাছীর বাঁশের মেলা এখনও নিজস্ব স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। স্থানীয়দের মতে, এ মেলার ইতিহাস চার থেকে সাড়ে চারশ বছরের পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে বাঁশকে ঘিরে নানা সামাজিক ও ধর্মীয় আচার পালিত হয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশেষভাবে সাজানো “মাদার বাঁশ”কে কেন্দ্র করেই শুরু হয় এ উৎসব।

প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম রবিবার একটি নির্দিষ্ট বাঁশ চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী রবিবার সেই বাঁশ কেটে লাল শালুকের কাপড়ে মুড়িয়ে সাজানো হয়। পরে “মাদার বাঁশ” বহনকারী দল ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। এ সময় লাঠিখেলা, কসরত ও বিভিন্ন লোকজ খেলার প্রদর্শনী করা হয়। ফলে পুরো জনপদজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।

স্থানীয়দের মধ্যে এখনও প্রচলিত রয়েছে—মেয়েরা বাপের বাড়ি আসবে, জামাই আসবে শ্বশুরবাড়ি। কোন বাড়ির জামাই কত বড় মাছ নিয়ে আসবে, তা নিয়েও চলে নীরব প্রতিযোগিতা। মাছ নিয়ে আসার পর জামাইকে দেওয়া হয় মেলার “পরবি” বা উপহারস্বরূপ টাকা। পাশাপাশি মেয়ে ও জামাইকে নতুন কাপড় ও ছাতা উপহার দেওয়ার রীতিও এখনও অনেক পরিবারে চালু রয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মেলার সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ওঁরাও ও মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে বাঁশ ছিল পবিত্রতার প্রতীক। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়ে ধীরে ধীরে এটি বৃহৎ লোকজ উৎসবে রূপ নেয়।

মেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানান, ধান কাটা ও মাড়াই শেষে এ আয়োজন গ্রামীণ জনপদে বাড়তি আনন্দ নিয়ে আসে। আত্মীয়-স্বজনের আগমন, জামাই আপ্যায়ন এবং লোকসংস্কৃতির মিলনে এটি এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো বাঁশের তৈরি নানা সামগ্রী। এখানে পাওয়া যায় ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, হাতপাখা, মাছ ধরার ফাঁদসহ গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ। এছাড়াও মাটির খেলনা, লোকজ অলংকার, কৃষি সরঞ্জাম, ঐতিহ্যবাহী দই-মিষ্টি, ঝুড়ি-মুড়কি এবং বড় বড় মাছের দোকানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। ফলে পুরো মেলাপ্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছে গ্রামীণ জনজীবনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।

একসময় এ মেলায় লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, পালাগান, জুমুর গান ও গ্রামীণ নাটক ছিল প্রধান আকর্ষণ। আধুনিক বিনোদনের প্রভাব পড়লেও এখনও লোকজ সংস্কৃতির অনেক উপাদান টিকে আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও মেলাটির গুরুত্ব অপরিসীম। আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পসরা সাজান। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারুশিল্পীরা তাদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পান। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় প্রাণচাঞ্চল্য। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্যেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বলেন, “নিমগাছীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শতবর্ষী এ আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।”

স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মেলা নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে। নিমগাছীর ঐতিহ্যবাহী বাঁশের মেলা শুধু একটি লোকজ উৎসব নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও লোকঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। আধুনিকতার এই যুগেও শতবর্ষী এ আয়োজন আমাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা শুধু স্থানীয় মানুষের নয়, বরং পুরো দেশের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।#


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হিলিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু

সিরাজগঞ্জে নদী থেকে কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

বারহাট্টায় চেয়ারম্যান প্রার্থী রতন মেম্বারের উঠান বৈঠক

বেলকুচিতে জমি নিয়ে বিরোধে বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, আহত ১০

বেলকুচিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান

রায়গঞ্জে গভীর রাতে আগুন, পুড়ল বিধবার ছেলের বিয়ের টাকা-স্বর্ণ

রায়গঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান

রায়গঞ্জে জামায়াতের লংমার্চ সফল করতে প্রস্তুতি সভা

তাড়াশে গৃহবধূকে পথরোধ করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা, প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

রাজনীতিতে নির্যাতন-কারাভোগ, এবার জনগণের রায়ে চেয়ারম্যান হতে চান পলাশ

১০

অচিন্ত তালুকদারের মৃত্যুতে শোক, মরদেহ দেখতে গেলেন বিএনপি নেতা শামসুল ইসলাম

১১

বারহাট্টায় নির্ধারিত দামের বেশি সার বিক্রি, দুই ডিলারকে জরিমানা

১২

ধামরাইয়ে দুই লাখ টাকার নকল সিগারেট ধ্বংস

১৩

শিক্ষার্থীদের হয়রানি নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: রায়গঞ্জে এএসপি সাইফুল

১৪

ঢাকা থেকে রংপুর লং মার্চ: পাঙ্গাসীতে জামায়াতের প্রস্তুতি সভায় নানা সিদ্ধান্ত

১৫

ঠাকুরগাঁওয়ে ৮০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

১৬

আধুনিকতার যুগে ঘোড়ার হাল, এভাবেই সংসার চালান শফিকুল

১৭

রায়গঞ্জে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে তরুণী নিখোঁজ, ৫ দিনেও মেলেনি সন্ধান

১৮

বেলকুচিতে বেকারি ও ভোজ্য তেলের বাজারে অভিযান, জরিমানা ৮০ হাজার টাকা

১৯

রায়গঞ্জে এলপিজির অনুমোদনের আড়ালে পেট্রোল-ডিজেল বিক্রি, জরিমানা

২০